৬ পর্বের বড় লেখার পর্ব : ৬ (শেষ পর্ব)
:
মৃত্যু জেনেও ভয়াবহ সমুদ্রপথে পাড়ি দিচ্ছে কেন
বাংলাদেশের মানুষ
:
ভুটান, নেপাল বা ভারতের মানুষ এভাবে মৃত্যু ঝুকি নিয়ে
সমুদ্রপথে বিদেশে পাড়ি না দিলেও, বাংলাদেশের মানুষ কেন নিচ্ছে এমন ঝুঁকি? বাংলাদেশের মানুষ কি রাষ্ট্রহীন, মর্যাদাহীন রোহিঙ্গা। তারা কি নিজ দেশে শরণার্থী।
এ প্রশ্ন আজ যৌক্তিক বহু মানুষের কাছেই। এদেশের সপ্তপদি মানসিকতা আর সমাজ নিরিক্ষক
হিসেবে বলবো বেশ কটি কারণে বাংলাদেশের মানুষ সমুদ্রপথে জীবন ঝুকি নিয়ে পাড়ি দিচ্ছে, যা নিম্নরূপ :
(১) বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের সময় এখানের
জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। পার্শ্ববতী দেশগুলোতে জনসংখ্যা তেমন না বাড়লেও, হু হু করে এদেশের মানুষ ১৬/১৭-কোটির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। চীনে কাপল-প্রতি ১-সন্তান নীতি কঠোরভাবে গ্রহণ
করা হলেও বাংলাদেশে এমন কোন নীতি নেই। এখানে কোন কোন মুসলিম পরিবারে সন্তান ৮/১০
টি পর্যন্ত দেখা যায়। কতটা বেশি বাংলাদেশের জনসংখ্যা? একটা উদাহরণে বোঝা যেতে পারে। দেখা যাক কটি দেশের আয়তন
ও জনসংখ্যার তুলনা। ফিনল্যান্ডের আয়তন ৩,৩৭ ,০৩০ বর্গকিমি, জনসংখ্যা ৫৪ লক্ষ। নরওয়ের আয়তন ৩,২৪,২২০ বর্গকিমি, জনসংখ্যাঃ৫০লক্ষ। বাংলাদেশের আয়তন ১৪৭,৫৭০ বর্গকিমি।জনসংখ্যা ১৫৬,৪৯৯,৬৭৩। নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশের প্রায় ৫-গুণ বড় কিন্তু
মানুষ মাত্র ৪০-লাখ, অপর দিকে বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডের ৫ ভাগের এক
ভাগ কিন্তু মানুষ প্রায় ১৬/১৭ কোটি। বাকিটার গাণিতিক হিসাব পাঠকরা করবে।
:
(২) এতো মানুষ বাড়ার পেছনে কারণ কি? সম্ভবত ধর্মীয় কারণে মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে
জনবিস্ফোরণ ঘটছে। কারণ ইসলামে জন্মনিয়ন্ত্রণকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ইসলামের নবী
বলেছেন, পৃথিবীতে যারা জন্ম নেয়ার তারা নেবেই, "আযল" ইত্যাদি করা না করা একই ব্যাপার। সে
হিসেবে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রি ব্যবহার হাস্যকর বা অহেতুক কাজ মাত্র। তা ছাড়া নবী
মুসলিমদের সংখ্যা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন, যাতে পুরো বিশ্ব মুসলিমরা শাসন করতে পারে।
এমনকি বন্ধ্যা নারীর বিবাহকে নিরুৎসাহিত করেছেন তিনি। নবী উর্বর নারী বিয়ের তাগিদ
দিয়েছেন। তা ছাড়া তকদির তথা ভাগ্যে বিশ্বাস একজন মুসলিমের ইমানের অঙ্গ, তাই তকদিরবাদি মুসলিমরা শিশুর জন্ম, তার খাদ্য ইত্যাদিকে আল্লাহ প্রদত্ত হিসেবে
বিশ্বাসের কারণে এদেশে জনসংখ্যা হ্রাসে তারা কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
:
(৩) ধারণ ক্ষমতার বাইরে জনসংখ্যা বাড়াতে দেশে
ভয়াবহ বেকারত্বের সৃষ্টি হচ্ছে। সেকেলে ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতিবিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা সমাজে খুব একটা
কাজে লাগছে না। বিদেশে যখন ব্যাপক চাহিদা বাড়ছে সেফ (কুক), নাপিত, নানাবিধ টেকনিশিয়ানের, দেশে তখন লাখো ইতিহাস/দর্শনভিত্তিক বেকার তৈরি
হচ্ছে। তারা না ঘরকা না ঘাটকা হচ্ছে। তাই বেকারত্ব, হতাশা, দারিদ্রতা, সামাজিক অস্থিরতা, ধর্মীয় সহিংসতা, জ্বালাও পোড়াও্ রাজনীতি ইত্যাদি কারণে অনেক
মানুষ দেশ ছেড়ে পালাতে চাইছে। কিন্তু এখানে ধর্মীয় কারণে ভিসা পাওয়া একটা বড়
সমস্যার সৃষ্টি করছে।
:
(৪) বাংলাদেশের বাঙালিরা প্রাচীনকালে থেকেই
অসাম্প্রদায়িক হলেও, বিগত দিনগুলোতে ধর্মান্ধতা, জঙ্গী তৎপরতা, মাদ্রাসা শিক্ষা, ব্লগার হত্যা ইত্যাদি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক
কারণে এদেশের মুসলিম নামধারী মানুষদেরকে বিদেশিরা মারাত্মক ঋণাত্মক দৃষ্টিতে
দেখছে। এটা আমি নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, বৃটেন ইত্যাদি দেশ ভ্রমণে দেখেছি। নানা তথ্য
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ ভুটানের মত অনুন্নত
দেশের নাগরিকদের জন্য তাদের ভিসা নীতি বেশ শিথিল রাখলেও, বাংলাদেশের মত বেশ কটা রাষ্ট্রের জন্যে করেছে
কঠোরতর। এমনও তথ্য পাওয়া গেছে যে বৃটেন, আমেরিকা বা কানাডা বাংলাদেশের ননমুসলিম
প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষককে তাদের দেশের ভিসা দিলেও, মুসলিম নামধারী সরকারি কলেজের অধ্যাপককে ভিসা
দেননি। এমনকি গুলশানে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা করছেন, বহু দেশে ভ্রমণের ভিসাধারীকে কোটিপতি মুহাম্মদ
নামধারী বাংলাদেশিকে বৃটেনের ভিসা দেয়া হয়নি।
:
(৫) এভাবে বৈধ ভ্রমণ, চাকুরি বা স্টুডেন্ট ভিসা না পেয়ে বহু বাংলাদেশি
মুসলিম নাগরিক জীবন বাজি রেখে নৌকোযোগে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মালয়শিয়া বা ইতালি
যেতে চাইছে। এর সাথে যোগ হয়েছে মানব পাচারের দালালচক্রে, সাম্প্রতিক বাংলাদেশের সর্বত্র ব্যাপক ভোগবাদী
তথা হঠাৎবড়লোক হওয়ার চিন্তন ইত্যাদিও এখানে বড় ভুমিকা রাখছে। একজন ভুটানি
টিন+কাঠের সাধারণ ঘরে বাস করে, শাকপাতা খেয়ে সন্তুষ্ট থাকলেও, বাংলাদেশে যেন প্রত্যেকেরই বিলাসবহুল ফ্লাট আর
গাড়ি না কিনলেই নয়। যে কারণে কেউ দেশে দুহাতে টাকা লুটছে, আর হতাশায় নিমজ্জিত গ্রুপ চাইছে বিদেশ গিয়ে
বড়লোক হবে।
:
এ থেকে উত্তোরণ সহজ নয়। তবে সরকারকে নিতে হবে
মূখ্য ভুমিকা। শিক্ষাকে আধুনিকায়ন করে জীবনভিত্তিক করতে হবে। বৈধপথে যেন বেকার
মানুষরা বিশ্বের সর্বত্র সহজে গমন করতে পারে তার ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে।
ঢাকার পুরণো বিমানবন্দরের অব্যবহৃত স্থানে নানাবিধ প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা
করে সেখানে বেকার ছেলে মেয়েদের রেখে ১/২ বছরের জীবনভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে
পারে। যাতে বিশ্বমানের কুক, নাপিত, কার্পেন্টার, শিপমেকার ইত্যাদি হাজারো পেশাধারী দক্ষ জনশক্তি
তৈরি করে সরকারিভাবে তাদের বিনে পয়সায় বা নামমাত্র টাকায় বিদেশ পাঠানো যেতে পারে।
:
আর চীনের পদ্ধতি অনুসরণ করে কাপলপ্রতি ১-সন্তান
নীতি বাস্তবায়ন না করলে বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে। চীনের মত একদলীয়
বাকশালি শাসন ব্যবস্থা এদেশে থাকলে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল যেমন সৃষ্টি হতে পারতো
না বাংলাদেশে, তেমনি জনসংখ্যা হয়তো এখনো ৮-কোটিতেই সীমাবদ্ধ
থাকতো। তাতে জীবন বাজি রেখে মানুষকে এভাবে সমুদ্র পাড়ি দিতে হতো না। কৈ চীনের
মানুষতো জনভারে আক্রান্ত হলেও সেখানের কোন মানুষ কি মধ্যপ্রাচ্যে গিয়েছিল? তারা কি তাদের মানুষের কর্মসংস্থান করেনি
একদলীয় শাসন ব্যবস্থায়? বাংলাদেশকে খেয়েছে ধর্ম আর বহুদলীয় গণতন্ত্রের
নামে ধনীক শ্রেণির "ঘনতন্দ্র"। এটা যত তাড়াতাড়ি এ দেশের মানুষ অনুধাবন
করতে পারবে, ততই বাংলাদেশ তার ঋণাত্মক চিন্তন থেকে
ইতিবাচকায় ফিরে আসবে। এ দেশের নাগরিক হিসেবে সে দিনের প্রতিক্ষায় রইলাম।
:
মোট ৬ পর্বে লেখাটি শেষ
:
তথ্যসুত্রঃ লেখাটি লিখতে নেট, উইকিপিডিয়া এবং অন্যান্যসূত্র থেকে তথ্য নেয়া
হয়েছে।
লেখাটি ফেসবুকে দেখতে চাইলে নিচের লিংকে যান প্লিজ
https://www.facebook.com/photo.php?fbid=1703974359836713&set=a.1381466915420794.1073741828.100006724954459&type=1&theater
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন