৬ পর্বের বড় লেখার পর্ব : ৫
:
সর্বশেষ কথা
:
একের পর এক এসব মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা দেখতে
দেখতে অনেকের কাছে তা হয়তো কিছুটা চোখ-সওয়া হয়ে গেছে। এখনো তাই ইউরোপীয়
রাজনীতিকদের অনেকের কণ্ঠে মানবিকতার লেশমাত্র নেই। প্রায় এক দশক বা তারও বেশি সময়
ধরে ইউরোপে অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি একটু একটু করে শক্তি সঞ্চয় করে মূলধারায় প্রধান
প্রতিদ্বন্দ্বীর অবস্থান দখল করে নিয়েছে। ফলে মধ্যপন্থীরাও তাঁদের ভাষা বদলে
ফেলেছেন। নিজেদের ঔপনিবেশিক ইতিহাস ভুলে গিয়ে এখন এঁদের কেউ কেউ অভিবাসীদের লুটেরা
বলতেও পিছপা হচ্ছেন না। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিলিপ হ্যামন্ডের ভাষায়, এঁরা ইউরোপের উন্নত জীবনযাত্রার মানকে নষ্ট
করতে চায় (মরাডিং মাইগ্রেন্টস থ্রেটেন ইউরোপিয়ান লিভিং স্ট্যান্ডার্ড, সেইজ ফরেন সেক্রেটারি; গার্ডিয়ান, ১০ আগস্ট, ২০১৫)। তিনি বলেন, আফ্রিকার লাখ লাখ অভিবাসীকে গ্রহণ করতে বাধ্য
হলে ইউরোপ নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না।
:
শরণার্থীদের প্রতি মানবিক আচরণের নীতি অনুসরণ
না করে সবাইকে গড়পড়তা অর্থনৈতিক অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টায় গণমাধ্যমেও
কিছুটা প্রতিবাদ উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বৈশ্বিক টিভি চ্যানেল আল-জাজিরা
অভিবাসী দেশান্তরি হতে চাওয়া মানুষের স্রোতকে কেন্দ্র করে ভূমধ্যসাগরের সংকট-বিষয়ক
খবরে ‘অভিবাসী’ শব্দটি ব্যবহারে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
আল-জাজিরার অনলাইন সম্পাদক ব্যারি ম্যালোন তাঁর ব্লগে এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা
দিয়ে বলেছেন, শরণার্থীরা যে পরিমাণ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন, তাকে অভিবাসী অভিধা দিয়ে খাটো না করে তাঁদের
কষ্টের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্যই তাঁদের এই সিদ্ধান্ত। ব্রিটেনের দুটো বামঘেঁষা
পত্রিকা গার্ডিয়ান ও ইনডিপেনডেন্ট পাঠকদের জন্য অভিবাসী ও শরণার্থীর ব্যাখ্যা
ছেপেছে, যাতে রাজনীতির বিতর্কে মানবিক বিবেচনা হারিয়ে
না যায়। শরণার্থী ও অভিবাসীদের স্রোত প্রথম যেখানে এসে তীরে ভিড়ছে, তা হলো ভূমধ্যসাগরের পাড়ের দুটো দেশ—গ্রিস ও ইতালি। তারপর অন্যান্য দেশে যাঁরা
ঢুকতে পারছেন, কিংবা জাতিসংঘ বা অন্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর
সহায়তায় আশ্রয় প্রার্থনা করতে পারছেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় জায়গা
পেয়েছেন জার্মানিতে। এরপর আছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কয়েকটি দেশ।
:
উএনএইচসিআর বলছে, চলতি বছরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আসা
শরণার্থীর সংখ্যা ইতিমধ্যে তিন লাখ ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১৯
হাজার। সংস্থার হিসাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানো শরণার্থীদের মধ্যে ২
লাখ এসেছেন গ্রিসে এবং প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার এসেছেন ইতালিতে। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে
প্রায় দেউলিয়া হতে যাওয়া গ্রিস এবং ইউরোপে সমৃদ্ধির দিক থেকে পিছিয়ে থাকা ইতালির
ওপর যে বোঝা চেপেছে, তা যে তাদের সাধ্যের বাইরে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের
নেতারা একের পর এক বৈঠক করেও জোটগতভাবে এ বিষয়ে কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান বের
করতে পারেননি। তাঁদের এই যৌথ ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ এক শিল্পী ইউরোপীয় ইউনিয়নের পতাকার
এক নতুন দেয়ালচিত্র এঁকেছেন, যাতে ১২টি তারার জায়গায় তিনি বসিয়ে দিয়েছেন
হাত-পা ছড়িয়ে ভেসে থাকা লাশ—নৌকাডুবির পর ভূমধ্যসাগরের নীল পানিতে ভেসে
থাকা অভিবাসীদের হুবহু প্রতিচ্ছবি। একজন অজ্ঞাতনামা ব্রিটিশ শিল্পীর এই প্রতিবাদী
ছবি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ঝড় তুলেছে। এই ছবি শেয়ার হয়েছে হাজার হাজার, যা বৈশ্বিক প্রতিবাদের এক নতুন রূপ।
:
নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, মৃত্যুর মিছিলে এমন অনেকেই ছিলেন, যাঁরা যুদ্ধ থেকে বাঁচার আশায় কোলের সন্তান
নিয়ে অনেক বাধা পেরিয়ে ইউরোপে প্রায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। বৈধভাবে নিরাপদে যাওয়ার
কোনো পথ না থাকায় সহায়-সম্বলের সবটুকু না হলেও অনেকটাই তুলে দিয়েছিলেন তাঁদের
কাছে, যাঁরা এঁদের ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব
নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাগরে ডুবে অথবা নৌকার খোলের ভেতরে বা রাস্তায়
ট্রাকের পেছনে দম বন্ধ হয়ে তাঁদের মৃত্যু ঘটেছে। ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র মেলিৎসা
ফ্লেমিং বলেছেন, ‘আমরা বেঁচে যাওয়া কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছি এবং
তাঁরা বলেছেন, পাচারকারীরা তাঁদের কাছ থেকে নিশ্বাস নেওয়ার
প্রয়োজনে নৌযানের পাটাতনে ওঠার জন্যও টাকা আদায় করেছে। বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের একজন
বলেছেন, তাঁরা নৌকার খোলের ভেতরে নামতে না চাইলে
পাচারকারীদের লোকেরা লাঠি দিয়ে তাঁদের পিটিয়েছে। ভেতরে কোনো বাতাস ছিল না, তাই তাঁরা খোলের ছাদের ফাঁকফোকর অথবা ছোট দরজা
খুলে দম নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।’
:
গত ১৮ জুন ইউএনএইচসিআর ২০১৪ সালের শরণার্থীদের
প্রবণতার যে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তার শিরোনাম ছিল ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাট ওয়ার’ বা যুদ্ধে লিপ্ত পৃথিবী। এতে বলা হয়েছে যে
বিশ্বে গত পাঁচ বছরে অন্তত ১৫টি সংঘাত শুরু হয়েছে বা চলছে, যার আটটি আফ্রিকায় (কোট ডিভোয়া, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, লিবিয়া, মালি, নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চল, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ সুদান ও বুরুন্ডি), মধ্যপ্রাচ্যে তিনটি (সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেন), ইউরোপে একটি (ইউক্রেন) এবং এশিয়ায় তিনটি
(কিরগিজস্তান, মিয়ানমার ও পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল)।
তালিকায় নেই, কিন্তু সংঘাতের রেশ চলছেই, এমন আরেকটি বড় রাষ্ট্র আফগানিস্তান। তাদের
হিসাবে বিশ্বে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষ এবং দেশ
ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হওয়ার ক্ষেত্রে সবার ওপরে আছে সিরীয়রা, যার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। এসব শরণার্থীর সবচেয়ে
বড় অংশ আশ্রয় নিয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোয়, যাদের মধ্যে তুরস্কেই আছে প্রায় ২০ লাখ এবং
লেবাননে ১১ লাখ। তাদের হিসাবে, শরণার্থীদের প্রতি দশজনের নয়জনই প্রতিবেশী দেশগুলোতেই আশ্রয় নিয়েছে। যার
মানে দাঁড়াচ্ছে, ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলো—অর্থাৎ ইউরোপ, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ায় যাঁরা যাওয়ার চেষ্টা
করছে, তারা ১ শতাংশেরও কম। অথচ যুদ্ধগুলোর কারণ
খুঁজলে দেখা যাবে, বিশ্ব রাজনীতির প্রধান প্রধান কুশীলবের ভ্রান্ত
নীতি অথবা দায়সারা ভূমিকা এসব সংঘাত উসকে দেওয়া কিংবা প্রলম্বিত হওয়ার অন্যতম
কারণ।
:
শরণার্থীদের এই বিপুল সংখ্যার সঙ্গে যোগ হয়েছেন
দুই ধরনের বাংলাদেশি। এঁদের একদল হচ্ছে যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যে পড়ে যাওয়া প্রবাসী।
এঁরা বহু বছর ধরে পেশাগত কারণে পরিবার-পরিজন নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় আবাস
গড়েও শেষ পর্যন্ত সংঘাত থেকে মুক্তি পেতে বেপরোয়া ঝুঁকি নিচ্ছেন। লিবীয় উপকূলে
ডুবে যাওয়া নৌকা থেকে পরিবারের পাঁচজনকে নিয়ে উদ্ধার পাওয়া নারায়ণগঞ্জের প্রকৌশলী
মোহাম্মদ আলীর কাহিনি (প্রথম আলো , ৩১ আগস্ট, ২০১৫) পড়ে একই সঙ্গে যেমন আনন্দিত হই, তেমনি দুর্ভাবনাও পেয়ে বসে। আনন্দিত হই যে আড়াই
বছরের বাচ্চাসহ আরও তিন সন্তান এবং স্ত্রীকে তিনি ফিরে পেয়েছেন। কিন্তু ভাবনায় পড়ে
যাই ইউরোপে যাওয়ার আশায় তিনি এতটা ঝুঁকি কেন নিলেন, সেই প্রশ্নে। দেশে কি তাঁদের জন্য কোনোই
সুযোগ-সম্ভাবনা নেই? লিবিয়ার উপকূলে সাগরে হারিয়ে যাওয়া এবং বেঁচে
থাকা বাংলাদেশিদের অন্যদের বিচার-বিবেচনাও আলাদা কিছু ছিল না, এমনটি বোধ হয় ধরে নেওয়া যায়।
:
দ্বিতীয় আরেক দল বাংলাদেশি—অর্থনৈতিক অভিবাসীর কথা তো আমরা কয়েক মাস ধরেই
আলোচনা করছি। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে নৌকাডুবি এবং থাইল্যান্ড আর মালয়েশিয়ায় গণকবর
আবিষ্কারের ঘটনাগুলো এসব অভিবাসনকামীর বেপরোয়া ঝুঁকি নেওয়ার কারণগুলো অনেকাংশেই
স্পষ্ট করেছে। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হলেও আমাদের অর্থনীতি সবার চাহিদা অনুযায়ী
কর্মসংস্থানের দাবি পূরণে সক্ষম নয়। তারপর তো শাসনজনিত এবং রাজনৈতিক নানা সংকট
রয়েছেই।
:
ইউরোপের উপকূলে পৌঁছানোর জন্য বেপরোয়া শরণার্থীদের
সাম্প্রতিক মৃত্যুর ঘটনাগুলোয় ‘আতঙ্কিত এবং বেদনাহত’ জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, এ ধরনের অগণিত মানবিক বিপর্যয় বন্ধে
বিশ্বসম্প্রদায়ের যৌথ পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘সংঘাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে যারা পলায়ন করছে, তাদের নিরাপদে এবং বৈধভাবে সাগর এবং সীমান্ত
পাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে আমাদের আরও অনেক কিছু করা প্রয়োজন।’ তাঁর ভাষায়, এটি একটি মানবিক বিপর্যয় এবং এটি মোকাবিলায় যৌথ
রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। মুন বলেন, এটি সংহতি জানাতে না পারার সংকট, সংখ্যার সংকট নয়। মুন বলেন, ‘আসুন, আমরা সবচেয়ে বিপন্ন অবস্থায় থাকা এসব মানুষের
নিরাপত্তা এবং তাঁদের মধ্যে আশা জাগিয়ে রাখার জন্য আমাদের সাধ্যমতো সবকিছু করি।’ শরণার্থী বা আশ্রয়প্রার্থীদের সংকট আগামী
কিছুদিন বিশ্ব রাজনীতিকদের ব্যতিব্যস্ত রাখবে সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশি
অভিবাসনকামীদের, বিশেষ করে অর্থনৈতিক কারণে যাঁরা দেশান্তরি হতে
চান, তাঁদের সমস্যার সমাধান কী? আমাদের রাজনীতিক বা নীতিনির্ধারকেরা কি বিদেশে
পরিত্যক্ত অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনা মানুষের মধ্যে কোনো জরিপ চালিয়ে দেখেছেন যে
তাঁদের দেশত্যাগ থেকে নিবৃত্ত করার জন্য কী করা প্রয়োজন? তাঁদের মধ্যে দেশের প্রতি আস্থা ধরে রাখা এবং
আশা জাগিয়ে রাখার জন্য কোনো কিছুই কি আমাদের করার নেই?
:
লেখাটি ফেসবুকে দেখতে চাইলে নিচের লিংকে যান প্লিজ
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন