বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

কুসংস্কারে ভরা বাংলাদেশের গ্রাম প্রবন্ধ # ১৮



পানিতে ডোবা, সাপে কামড় ও ভূতে পাওয়ার চিকিৎসা প্রসঙ্গে

বাংলাদেশে একেক সময় একেক বিষয় নিয়ে খুব জোরে-সোরে প্রচার প্রচারণা করা হয়। এর পর ঐ বিষয়টি নিয়ে তেমনটি আর লক্ষ্য করা যায় না, মানুষ অনেকটা ভুলে যায়। যৌতুক প্রথা, এইডস, এসিড মারা, জন্ম নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, পরীক্ষায় নকল বন্ধ করা, নারীর সমানাধিকার, জেন্ডার বিষয়, নারী নির্যাতন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আমরা অনেক সভা-সমিতি, কর্মশালা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ইত্যাদি করতে দেখেছি। বর্তমানে রানিং ইস্যু ছিল ‘ইভ টিজিং’ বন্ধ করা। আমাদের ঢাকাইয়া চলচ্চিত্র ও নাটকে ‘বস্তির রংরাজ মাস্তান’ কর্তৃক বড়লোকের ভার্সিটি পড়ুয়া সুন্দরী মেয়েকে যেখানে সেখানে ‘ইভ-টিজিং’ করার পর গভীর প্রেমের মাধ্যমে ঐ টিজিংকে বৈধতা দান এখন অনেকটা সামাজিক নৈতিকতায় পরিণত হয়েছে। ঐ চলচ্চিত্রের দর্শকরা (যারা মূলত নিম্ন আয়ের অশিক্ষিত মানুষ) যা এখন তাদের জীবনেও বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে যেখানে সেখানে, কারণ সিনেমা দেখে তাদের ধারণা জন্মেছিল ‘ইভ টিজিং’ অবৈধ কোন ব্যাপার নয়। যাই হোক, সাম্প্রতিক শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য বিভিন্ন সংগঠন কর্তৃক ব্যাপক প্রচারণার ফলে আশা করা যায় এ ধারাটি কিছুটা কমবে। আমাদের সমাজ বিজ্ঞানীদের এখন ভাবার সময় এসেছে ‘ঢাকাইয়া’ সিনেমা থেকে স্বাধীনতার পর আমরা চল্লিশ বছরে কি পেলাম, কি শিখলাম? আর আমাদের সমাজে অস্থিরতা, নৈতিকতাহীনতা ও বিবিধ নেতিবাচক কর্মকান্ডের জন্যে এই সিনেমা কতটুকু দায়ী। ঢাকার বাংলা সিনেমা প্রসঙ্গে থাক, পানিতে ডুবে ও সাপের কামড়ে মৃত্যু সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি প্রসঙ্গে যা বলতে চেয়েছিলাম।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে (এমনকি শহরেও) প্রতি বছর পানিতে ডুবে কয়েক হাজার শিশু মৃত্যুবরণ করে। ঘরের পাশেই পুকুর, ডোবা, খাল, নদী থাকাতে এই দুর্ঘটনা নৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রতিবছর আমার চোখের সামনে অনেক অবুঝ শিশু-মৃত্যুর ঘটনা আমি নিজেই প্রত্যক্ষ করেছি। একইভাবে নদী-খালবিল সমৃদ্ধ ঝোপ-ঝাড়ের দেশ হিসেবে প্রতিবছর এদেশে অসংখ্য মানুষ সাপের কামড়ে মৃত্যুবরণ করে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। এর প্রধান কারণ, গ্রামের অনেক গরিব মানুষ এখনো চাটাই বিছিয়ে ঘরের কাঁচা মেঝেতে ঘুমায়। রাতে সাপ চলাফেরা করতে গিয়ে বিশেষ করে বর্ষার দিনে কঁাচা ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে এবং দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এই দুটো মৃত্যু সম্পর্কে মানুষের মধ্যে খুব একটা সচেতনতা না থাকার কারণে পানিতে ডোবা শিশুটিকে পানি থেকে উঠানোর পর সবাই মিলে শুধু ‘কান্নাকাটি’ করতে থাকে, অন্য কোন প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা না করেই।

আর সাপে কামড়ানো ব্যক্তির জন্যেও আধুনিক ‘এন্টি-ভেনাম’ জাতীয় (যার কথা গ্রামের ৯৯ শতাংশ মানুষই জানে না) চিকিৎসার বদলে ‘ওঝা’ ডাকার জন্যে দৌড়াদৌড়ি করেন। গ্রামাঞ্চলের হাঁটা পথে খবর দেয়ার পর ‘ওঝা’ আসতে আসতে কিংবা ওঝা কর্তৃক ঝাড়ফঁুক শুরু করতে করতে রোগী মারা যায়। রোগী মারা যাওয়ার পরও ‘ওঝা’ কর্তৃক চলে নানা রকম ‘কুসংস্কারের’ ওঝালির তেজারতি।

বর্ণিত দুই ধরণের মৃত্যু একদম বন্ধ করা না গেলেও, ব্যাপক প্রচার প্রচারণার মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সমাজ কল্যাণ, তথ্য প্রভৃতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে ছোট শিশুদের সঁাতার শেখানোর ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি, সঁাতার শেখার আগে পুকুর, খাল বা এই জাতীয় জলাশয়ের কাছে শিশুরা যাতে একা না যায়, সেদিকে নজর বা মোটিভেশন ওয়ার্ক করা জরুরী। শিশুরা পানিতে ডুবলে পানি থেকে ওঠানোর পর প্রাথমিক চিকিৎসা কিভাবে করতে হবে ইত্যাদি সম্পর্কেও ব্যাপক প্রচারণা দরকার।

একইভাবে সাপ, সাপের ধরণ, সাপের বিষ, কামড় দেয়ার কারণ, কামড় দেয়ার পর তাৎক্ষণিক করণীয়, সাপে কামড়ের আধুনিক চিকিৎসা, এন্টি ভেনাম ও এর প্রাপ্তি স্থান, ওঝা ও ঝাড়-ফঁুক বিষয়ক কুসংস্থার ইত্যাদি বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে মানুষের মন থেকে এ কুসংস্থার দূর করে কিভাবে রোগীকে বাঁচানো যায়, তার ব্যবস্থা করতে পারলে বছরে হাজার হাজার সাপে কামড়ের রোগী বাঁচানো সম্ভব। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই ডিজিট্যাল যুগেও কি আমরা আধুনিক হবনা? এ বিষয়ে এনজিওসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পত্র-পত্রিকা, রেডিও-টিভি, বিভিন্ন সেমিনার ইত্যাদির আয়োজন করে সচেতনামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করবে বলে প্রত্যাশা করি। তা ছাড়া উপজেলা পর্যায়ে সাপের বিষ প্রতিরোধের একমাত্র ঔষধ ‘এন্টি-ভেনাম’ সরবরাহের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ বাঞ্ছণীয়।

গ্রামাঞ্চলে আরেকটি রোগ হচ্ছে ‘ভুতে ধরা’ রোগ বিশেষ করে মেয়েদের। আমার চোখের সামনে অনেক ভূতে ধরা রোগীকে গ্রামীণ ‘ওঝা’ কর্তৃক নানা শারিরীক নির্যাতন, পানিতে চুবানো, গাছের সঙ্গে বেধে রাখা ইত্যাদি নির্যাতনমূলক অপচিকিৎসা দেখেছি। এ অপচিকিৎসায় কাউকে ভাল হতে না দেখলেও, ২-৩ জনকে মারা যেতে দেখেছি। একটি কেস স্টাডিঃ কিছুদিন আগে আমার প্রত্যন্ত গ্রামে আমার জনৈক মহিলা আত্মীয়কে কথিত ‘‘ভূতে’ ধরলে নানা তাবিজ, কবজ, ওঝার চিকিৎসা করার পরও মহিলার কোন উন্নতি না হওয়াতে সবাই খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে। রোগটি ছিল মূলত মানসিক। বিশেষ একটি কারণে প্রচন্ড মানসিক আঘাতের কারণে প্রায় ৩-মাস মহিলা একদম না ঘুমিয়ে, তেমন কিছু না খেয়ে কবরের কাছে শুয়ে থাকতো। না খেয়ে ও না ঘুমিয়ে তার জীবন শেষ পর্যায়ে চলে এলে, তাকে আমার উদ্যোগে শহরে এনে একজন ভাল ডাক্তার দেখানো হয়। ডাক্তার সব শুনে তাকে তাৎক্ষণিক সাল্যাইন পুশ করেন এবং এমন গভীর ঘুমের ঔষধ দেন, যাতে মহিলা ৩-দিন একটানা ঘুমিয়ে থাকেন এবং ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে ক্ষুধার কথা বলেন এবং খাবার খেতে চান।


আধুনিক ডাক্তারি ‘ভূতের’ চিকিৎসায় মহিলা ভাল হওয়াতে এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়, মহিলা এখন একদম ভাল আছেন। বিষয়গুলোর ব্যাপক প্রচারণা দরকার। আরো দরকার পত্র-পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে ‘গুণীন-ওঝা’ নামধারী ব্যক্তিরা যে চিকিৎসা করছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করা। এবং কাজটির অবশ্যই দায় সরকারের।








লেখাটি ফেসবুকে দেখতে চাইলে নিচের লিংকে যান প্লিজ
 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন