বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

ত্রিশোত্তর বাঙলা কবিতায় কলাকৈবল্যবাদ, অস্তিত্ববাদ ও তিন দ্রোহি কবি [পর্ব # ২ দ্বিতীয় দ্রোহি : অমিয় চক্রবর্তী] প্রবন্ধ # ৬

ত্রিশোত্তর বাঙলা কবিতায় কলাকৈবল্যবাদ, অস্তিত্ববাদ ও তিন দ্রোহি কবি 
(পর্ব # ২) [প্রথম পর্বের পর]

দ্বিতীয় দ্রোহি : অমিয় চক্রবর্তী
“অতন্দ্রিলা 
ঘুমোও নি জানি 
তাই চুপিচুপি গাঢ় রাত্রে শুয়ে 
বলি শোনো, 
সৌরভতারা ছাওয়া এই বিছানায় সুক্ষজাল রাত্রির মশারী 
কতদীর্ঘ দুজনার গেলো সারাদিন, 
আলাদা নিশ্বাসে- - - 
এতক্ষণে ছায়া ছায়া পাশে ছুঁই 
কি আশ্চর্য দুজনে দুজনা 
অতন্দ্রিলা 
হঠাত্ কখন শুভ্র বিছানায় পড়ে জোত্স্না 
দেখি তুমি নেই”

হ্যা অতন্দ্রিলার এ কবিই আসলে অমিয়। ত্রিশোত্তর কবি হিসেবে পরিচিত জীবনানন্দ, অমিয় চক্রবর্তী ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পাশ্চাত্য অনুসঙ্গে বাংলা ভাষায় কলাকৈবল্যবাদি কবিতা রচনা করে নিজস্ব অস্তিত্বকে করেছেন অনুরণিত। ঐ কালপর্বে গণজাগরণের ঐক্যে বিভেদের ফলে সামাজিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে; সমাজসচেতন কবিরা আশ্রয় গ্রহণ করেন রোমান্টিক স্বপ্নলোকে। যতীন্ত্রনাথ সেনগুপ্ত তাঁর ২য় পর্বের বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে ওঠেন গভীর দু:খবাদি। আর তাই সামাজিক বাস্তবতার পর, অস্তিত্ববাদি ধারায় কাব্যরচনা করেন জীবনান্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪), অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১-১৯৮৬), সুধীন্দ্রনাথ দ্দ (১৯০১-১৯৬০), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) এবং বিষ্ণু দে (১৯০৯-১৯৮১) প্রমুখ কবিরা। ভারতের ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গের যুগে, হতাশা ও অনৈক্যের সময় এ কবিরা তাঁদের আদর্শ খুঁজে পান, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী (১৯১৯-১৯৩৩) ইউরোপের আত্মাবাদি কবিদের মাঝে। ইউরোপিয় কবিদের ধারা অনুসরণ করে, অস্তিত্ব সংকটের ও মনোবেদনার চিত্র অঙ্কন করেন তাঁরা এক নতুন অর্ক্টেস্ট্রায়।

দ্বিতীয় দ্রোহি : অমিয় চক্রবর্তী

সদ্য বিবাহিত জীবনের আশ্রয়চেতনায় জীবনানন্দ দাশ রচনা করেন স্বপ্নের রূপসী বাংলা (১৯৩৩-১৯৩৪), বুদ্ধদেব বসু নতুন পাতা (১৯৩২-৩৩) আর হৈমন্তির করকলমে উৎসর্গিত উপহার (১৯২৭) রচনা করেন কবি অমিয় চক্রবর্তী বিবাহ উপলক্ষে, বিতরণের জন্য। রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে ও উপস্থিতিতে ডেনমার্কের শ্বেতাঙ্গি ললনা হিওর্ডিস সিগোর (Hijordis Sigguard) সঙ্গে শান্তিনিকেতনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন কবি। তারই প্রেম লাবণ্য মাখা ষ্পর্শ উপহার-এ লক্ষণীয়।

প্রেমবোধে উজ্জীবিত হয়ে এ কবি আশ্রয় গ্রহণ করেছেন প্রকৃতিতে। আজীবন কলকাতায় লালিত হয়েছেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও বিষ্ণু দে – টি এস এলিয়টের লন্ডন ও বোদলেয়ারের প্যারিসের প্রতিধ্বনি শোনা যায় এ দু’কবির কলকাতায়। কিন্তু এ পর্বে মফস্বলের তিন কবি জীবনানন্দ দাশ (বরিশাল), অমিয় চক্রবর্তী (গৌরিপুর, আসাম) ও বুদ্ধদেব বসু (নোয়াখালি কুমিল্লা) প্রকৃতি চেতনার সাথে ঘনিষ্ঠ। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সচিব থাকাকালীন (১৯২৬-১৯৩৩) সময়ে রচিত উপহার এ প্রাকৃতিক পরিবেশ।

প্রকৃতিচেতনা ও প্রেমচেতনায় এসে মিশেছে অমিয় চক্রবর্তীর আধ্যাত্মিকতা। ‘মহাকাল প্রণমিত বাণী‘ পূজা ঘর, চেতনায় ছোঁওয়া পুণ্য, ধেয়ান উদয়াচলে, তাপস হৃদয়তলে, মরমে চেতনা সম, জ্যোতির শিখা, প্রভাত সূর্য্য আঙন, নিবেদিতা, ফুলের গীতা, আলোকের শুভ্র দৃষ্টি, প্রভৃতি শব্দব্যবহারে বিধৃত হয়ে আছে তাঁর আধ্যাত্মিকতার স্বরূপ। কবিতাটি সমাপ্ত হয়েছে অবিনাশী আশাবাদে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে টমাস হার্ডির কাব্যের উপর ডি.ফিল গবেষণা পর্বে (১৯৩৪-১৯৩৭) খসড়া (১৩৪৫) রচিত --- এখানে তাঁর স্বাভাবিক আধ্যাত্মিকতায় এসে জড়িত হয়েছে বিজ্ঞানচেতনা। এ সময়েই স্পেন্ডার, অডেন, সিসিল ডে লুইস, লুই ম্যাকনিস প্রমুখের কবিতায় প্রবল হয়ে ওঠে বিজ্ঞান, যুক্তি আর যান্ত্রিকচেতনা। কবির মতে, বিজ্ঞান শুধু যে আমাদের প্রজ্ঞাই বাড়াচ্ছে তাই নয়, সে বিস্তৃত করছে সৌন্দর্যের সীমানা, উন্মুক্ত করছে নতুন রসের দিগন্ত। অুনবীক্ষণ যন্ত্র কেবল রোমান্টিকের সহজ বিস্ময়কে বিনষ্ট করেনি, অনেক অজানা সৌন্দর্যের সন্ধানও দিয়েছে। শুধু ফলিত বিজ্ঞান নয়, বৈজ্ঞানিক চিন্তাও (theories) অমিয় চক্রবর্তীকে নাড়া দিয়েছে। অমিয় চক্রবর্তীর মতে, সমষ্টির বিসঙ্গতি সমস্যার সমাধান হলেই ব্যষ্টির বিসঙ্গতি-সমস্যার সমাধান হয় না; সমষ্টিরি জন্য চািই বিজ্ঞানে কল্যাণ সন্ধি। আইনস্টাইনের (১৮৭৯-১৯৫৫) মতো কবি আতধ্যাত্মিক দৃষ্টি ও বিজ্ঞানচেতনার সম্বনয়ে পূর্ণদর্শন গড়ে তুলতে চেয়েছেন কিন্তু তা রবীন্দ্রনাথ থেকে পৃথকধর্মী হয়েছে।

নতুনের প্রবর্তনায় অমিয় চক্রবর্তী ‘অনুভূতির বিচিত্র সূক্ষ্ম রহস্যে‘ সঞ্চরণ করেছেন। নতুন কালের বেদনা ও প্রেরণাকে তিনি ভাষারূপও দিয়েছেন স্বকীয় স্বাতন্ত্র্যে। প্রথম ব্শ্বিযুদ্ধ পরবর্তী বুর্জায়া বাস্তবতার ভাঙন, অনিশ্চয়তা, উল্লম্ফন ও বিপর্যয়কে রূপ দিতে ব্যবহার করেছেন টেলিস্কোপিয় শব্দ। শব্দার্থতত্ত্বে বিপর্যয়, মিতব্যয়িতা, উল্লম্ফন, পরিভাষার বহুল ব্যবহার ও যান্ত্রিক চিত্রকল্প ব্যবহারে, নুতন যুগের প্রবর্তনা লাভ করেছে আঙ্গিক সাফল্য। আইজেনস্টাইনিয় দ্বান্দ্বিক সিনেমার ধরনে কবি আপাত অসংলগ্ন এমনকি পরষ্পরবিরোধি শব্দ প্রতিস্থাপন করে, সংঘর্ষজাত সিনথেসিস তৈরি করেছেন। উল্লম্ফনের কৌশলে পূর্বাপরতা, ক্রমবিন্যস্ততা রক্ষিত হয়নি; রূপায়িত হয়েছে যুগিয় চাঞ্চল্য ও যুক্তিহিনতা। বাকরীতি ও কাব্যরীতির মিশ্রণ করতে গিয়ে জীবনানন্দ দাশ পঙক্তিতে এনেছেন বিস্তৃতি, অমিয় চক্রবর্তী ভাঙাপয়ার ব্যবহার করেছেন। গদ্যের ফাঁকে ফাঁকে পদ্যের ঝিলিক দেয়া প্রচ্ছন্ন মিলের রচনাতে-কবি বোধ করেছেন স্বাচ্ছন্দ্য। আর তাই কবি কখনো অতন্দ্রিলার খোঁজে চষে বেড়িয়েছেন মহাপৃথিবী! বলছেন-

কোথায় চলছে পৃথিবী
তোমারও নেই ঘর
আছে ঘরের দিকে যাওয়া।
সমস্ত সংসার
হাওয়া
উঠছে নীল ধূলোয় সবুজ অদ্ভূত;
দিনের অগ্নিদূত
আবার কালো চক্ষে বর্ষার নামে ধার।
কৈলাস মানস সরোবর
অচেনা কলকাতা শহর—
হাঁটি ধারে ধারে
ফিরি মাটিতে মিলিয়ে
গাছ বীজ হাড় স্বপ্ন আশ্চর্য জানা
এবং তোমার আঙ্কিক অমোঘ অবেদন
আবর্তন
নিয়ে
কোথায় চলছে পৃথিবী।
আমারও নেই ঘর
আছে ঘরের দিকে যাওয়া।
কবিরা জীবনের জলসিঁড়িতে কেবল এ ঘর খুঁজে মরে কাল থেকে কালান্তরে! অমিয় চক্রবর্তীও এর ব্যত্যয় করেননি। কিন্তু তাঁর ঘর কোথায়? পাঠক জানেন এ ঘরের খবর?


লেখাটি ফেসবুকে দেখতে চাইলে নিচের লিংকে যান প্লিজ

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন