বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

ত্রিশোত্তর বাঙলা কবিতায় কলাকৈবল্যবাদ, অস্তিত্ববাদ ও তিন দ্রোহি কবি [পর্ব # ১ প্রথম দ্রোহি : জীবনানন্দ দাশ] প্রবন্ধ # ৫


প্রথম দ্রোহি : জীবনানন্দ দাশ

 
কবিতার নাকি সুনির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। প্রশ্ন হচ্ছে সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই কেন ? কারণ কবিতা বিজ্ঞান নয়। কবিতা যেহেতু বিমূর্ত মাধ্যম এবং যারা এ মাধ্যমে কাজ করছেন তাদের ব্যক্তিক অনুভূতি, ভাবনা, অভিজ্ঞতা, সময়কাল, চিন্তার বিবর্তন ও প্রকাশ ভিন্ন সুতরাং কবিতার সংজ্ঞাও ভিন্ন হতে বাধ্য। তাই বলা চলে কবিতার সংজ্ঞা ব্যক্তিক অনুভূতি প্রধান। তাই কি? দেখি কবিরা এ বিষয়ে কি বলেন-

হুমায়ুন আজাদের মতে, ‘যা পুরোপুরি বুঝে উঠবো না, বুকে,ওষ্ঠে, হৃৎপিণ্ডে, রক্তে, মেধায় সম্পূর্ণ পাবো না; যা আমি অনুপস্থিত হয়ে যাওয়ার পরও রহস্য রয়ে যাবে রক্তের কাছে, তার নাম 'কবিতা'।
‘যে লেখাটি সমকালের স্মৃতি বা স্বপ্নকে তুলে আনতে সক্ষম এবং একই সাথে সমকালকে অতিক্রমের যোগ্যতা রাখে, তাকেই বোধহয় কবিতা বলা যেতে পারে- ’রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’

”’আমি কবিতা লিখি অনায়াসে। যেমন সকলেরই ক্ষেত্রে জীবনের আশে-পাশে অসংখ্য সুলভ দুর্লভ মুহুর্ত নানা রূপে অনাবৃত হয়েছে আমার সামনে। আমি কোন কোন সময় সেই সব মহুর্তের স্বাক্ষর লিপিবদ্ধ করেছি সত্য-বিচ্যুতি না ঘটিয়ে, সেই আমার কবিতা।’ - সিকানদার আবু জাফর

কবিতা সম্বন্ধে ‘বোঝা’ কথাটাই অপ্রসঙ্গিক। কবিতা আমরা বুঝিনা, কবিতা আমরা অনুভব করি। কবিতা আমাদের ‘বোঝায়’ না ; স্পর্শ করে , স্হাপন করে একটা সংযোগ। ভালো কবিতার প্রধান লক্ষণই এই যে তা ‘বোঝা’ যাবে না , ‘বোঝানো ‘ যাবে না -বুদ্ধদেব বসু

সৈয়দ শামসুল হকের মতে ‘কবিতা হচ্ছে সর্বোত্তম ভাবের সর্বোত্তম শব্দের সর্বোত্তম প্রকাশ’ -।

“পাখীর নীড়ের সাথে নারীর চোখের সাদৃশ্য আনতে যে সাহসের দরকার সেটাই কবিত্ব।” – আল মাহমুদ ।
আবু সয়ীদ আইয়ুব বলেন, “কালের দিক থেকে মহাযুদ্ধ পরবর্তী এবং ভাবের দিক থেকে রবীন্দ্র-প্রভাবমুক্ত, অন্তত মুক্তি প্রয়াসী, কাব্যকেই আমরা আধুনিক কাব্য বলে গণ্য করেছি।“।

আর আমি বলি, কবিতা হচ্ছে শব্দ নির্মাণবিদ্যা, যা শব্দবিন্যাস আর বুননে গাঁথতে পারে এক চমকপ্রদ মালা, ইটের পর ইট গেঁথে একজন বাস্তুকার যেমন বানান বিশালাকার দৃষ্টিনন্দন কোন ইমারত, অনেকটা তেমনিই।

বাঙলা ভাষায় প্রাচীন, মধ্যযুগ, আর প্রাকআধুনিক যুগের প্রায় সকল কবিতাই মূলত এক বিশেষ পয়ার ধাচের। পশ্চিমা ঢংয়ে ৩-দ্রোহি কবি বাংলা কবিতায় দ্রোহের যে এক নতুন ঝড় তোলেন, তাই মূলত এ নিবদ্ধে দেখানোর চেষ্টা করা হবে, সপ্তপদি অনুৃসঙ্গে!

ত্রিশোত্তর কবি হিসেবে পরিচিত জীবনানন্দ, অমিয় চক্রবর্তী ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পাশ্চাত্য অনুসঙ্গে বাংলা ভাষায় কলাকৈবল্যবাদি কবিতা রচনা করে নিজস্ব অস্তিত্বকে করেছেন অনুরণিত। ঐ কালপর্বে গণজাগরণের ঐক্যে বিভেদের ফলে সামাজিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে; সমাজসচেতন কবিরা আশ্রয় গ্রহণ করেন রোমান্টিক স্বপ্নলোকে। যতীন্ত্রনাথ সেনগুপ্ত তাঁর ২য় পর্বের বৈচিত্র্যপূর্ণতায় হয়ে ওঠেন গভীর দু:খবাদি। আর তাই সামাজিক বাস্তবতার পর, অস্তিত্ববাদি ধারায় কাব্যরচনা করেন জীবনান্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪), অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১-১৯৮৬), সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-১৯৬০), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) এবং বিষ্ণু দে (১৯০৯-১৯৮১) প্রমুখ কবিরা। ভারতের ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গের যুগে, হতাশা ও অনৈক্যের সময় এ কবিরা তাঁদের আদর্শ খুঁজে পান, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী (১৯১৯-১৯৩৩) ইউরোপের আত্মাবাদি কবিদের মাঝে। ইউরোপিয় কবিদের ধারা অনুসরণ করে, অস্তিত্ব সংকটের ও মনোবেদনার চিত্র অঙ্কন করেন তাঁরা এক নতুন অর্ক্টেস্ট্রায়।

প্রথম দ্রোহি : জীবনানন্দ দাশ

ঝরাপালক (রচনা : ১৯২৫-১৯২৭) -এর সামাজিক বাস্তবতার অধ্যায় ছেড়ে জীবনানন্দ দাশ প্রবেশ করেন ধূসর পাণ্ডুলিপি-রূপসী বাংলার ধূসর প্রকৃতি চেতনার জগতে; এ পর্বে প্রেমের অনুষঙ্গে প্রকৃতিচেতনায় আলোড়িত হয়ে কবি অঙ্গিকার করে নিয়েছেন অবধারিত মৃত্যুবোধকে। ধূসর পাণ্ডুলিপির (রচনা : ১৯২৫-২৯) প্রধান আচরণীয় বিষয় : মৃত্যুসাধ ধূসরতা, প্রেম-ব্যথা-বিহবলতা ও হৈমন্তিক নিসর্গলতা। কবি যে নিসর্গের বর্ণনা দেন তা হৈমন্তিক, ‘অবসরের গান’-এ সৌন্দর্য অবক্ষয়ের দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত; যে নারীর রূপ অঙ্কন করেন রূপ ঝরে পড়ে তার, শীত এসে নষ্ট করে দিয়ে যায় তা সৌন্দর্য। নি:স্বতার এক মানবিকচিত্র অঙ্কন করেন নির্জনতার অমর কবি জীবনানন্দ, যেখানে ‘দিকে দিকে চড়ুয়ের ভালবাসা’, ‘পাখির ডিমের খোসা, ঠাণ্ডা কড়কড়’ [পঁচিশ বছর পরে’. ধূসর পাণ্ডুলিপি]। ‘ক্যাম্পে’ কবিতায় কবির মনে হয়েছে: স্থুল হরিণ-শিকারিরাই শুধু প্রলোভনে ভুলিয়ে হিংসার আড়ম্বর জাঁকাচ্ছে না, সৃষ্টিই যেন তেমন এক শিকারি, আমাদের সকলের জীবন নিয়েই যেন তার সকল শিকার চলছে; প্রেম-প্রাণ-স্বপ্নের একটা ওলট-পালট ধ্বংসের নিরবচ্ছিন্ন আয়োজন যেন সব দিকে।

গোল্ডম্যান এ দ্বান্দ্বিক বাধ্যবাধকতাকে ত্রিভুজের দুইকোণ হিসেবে দেখেছেন; ঈশ্বর ও পৃথিবী এ বিষয় দুটো দুইকোনে এবং ত্রিভুজের তৃতীয় কোণে রয়েছে মানুষ বা ট্রাজিক ব্যক্তি। প্রেমের ক্ষেত্রেও কবি বেদনা-বিহবল; দুপায়ে পথ চলার পিপাসা সম্বল করে কবি প্রেমিকা উপভোগের নিমিত্ত করে নিয়েছে এই প্রকৃতিকে। আর কবি অভ্যস্ত পৃথিবী হারিয়ে ব্যথা-বিহবলতার নির্মাণ করে নিয়েছেন আত্মনিমজ্জনের ২য় জগৎ। প্রেমের হাতে পরাস্ত হয়ে হয়েছেন তিনি, পেয়েছেন অগাধের দেখা।

জীবনানন্দ দাশ ধূসর পাণ্ডুলিপি রচনা করেছিলেন বাজেট ঘাটতির কারণে কলকাতার সিটি কলেজের ছাঁটাই অধ্যাপকগণের তালিকাভুক্ত হওয়ার পর দুর্ভাগ্যজনক বেকারত্বের পর্যায়ে। কিন্তু ১৩৩৯-১৯৪০ সালে কবি যখন বিবাহিত জীবনের অনাস্বাদিত পূর্ব পরিতৃপ্তি ও প্রথম সন্তান লাভের আবেগে আক্রান্ত, তখন তাঁর মাঝে নিছক ক্লান্তি চেতনা নয়, ক্লান্তিমুক্ত অভিনব আশ্রয়চেতনা প্রবল হয়ে ওঠে। যার ফলস্বরূপ স্বপ্ন ও ধ্যানের জগৎ নির্মিত হয় রূপসি বাংলায়। যে মন্দার দাহ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে প্রবেশ করেন রূপকথার দেশে।

ধূসর পাণ্ডুলিপি – রূপসী বাংলার সম্প্রসারিত রূপ অঙ্কিত হয়েছে বনলতা সেন (রচনা : ১৯২৫-১৯৩৯) ও মহাপৃথিবীর (রচনা : ১৯২৯-১৯৪১) কবিতায়। ক্ষণিকপ্রেম থেকে উত্তীর্ণ হয়ে কবি পৌঁছেছেন স্বপ্নের জগতে: ‘বিপরীত দ্বীপে দূরে মায়াবীর আরশীতে’ পরিদৃশ্যমান রূপসীর কাছে। রোমান্টিসিজম, পরাবাস্তবতার স্পর্শে সান্দ্র হয়ে উঠেছে সেখানে। পূর্ববর্তী স্তরের প্রকৃতিচেতনা ও মৃত্যুধূসরতা অবসিত হয়েছে কিন্তু প্রেমময়তায় লেগেছে অমোঘ কালের স্বাক্ষর।

আন্তর-সংলাপ উন্মোচনে কাব্যরীতির স্থলে বাকরীতির নবতর শক্তি আবিষ্কারে সবচেয়ে সফল হয়েছেন জীবনানন্দ দাশ; মায়াবী পারের দেশ অঙ্কনে ভাষাকে করেছেন স্বপ্নভাষা। দেশি শব্দাবলি ব্যবহার করে, ধূসর পাণ্ডুলিপি ও রূপসী বাংলার অন্তরঙ্গ গার্হস্থ্য জীবনকে অনুপম ভাষাময় করেছেন কবি। ১৯১৯-১৯৩৩ কালপর্বের ইউরোপিয় কবিদের মত বেদনাবোধ ও ব্ষ্মিয়বোধকে ভাষারূপ দিতে, প্রধান করে তুলেছেন চিত্রধর্মকে। মৃত্যুবোধের সঙ্গতিসাধক বিস্ময়বোধ তাঁর কবিতায় বর্ণচেতনাকে, শব্দ ও পঙক্তির পৌন:পুনিক ব্যবহারে। এখানেই অনন্যতা, ভাস্কর্যময়তা, কবিত্ববোধ জীবনানন্দে!







[গবেষণাপত্রের এ লেখাটি ৩-পর্বে বিভক্ত, আগামিকাল পাওয়া যাবে ২য় পর্ব]



লেখাটি ফেসবুকে দেখতে চাইলে নিচের লিংকে যান প্লিজ
 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন