ইহুদি জাতির প্রতি নানাজাতির আক্রমনেও ফিলিস্তিনে ইহুদিরা টিকে ছিল তাদের ভাষা নিয়ে। ৬২৩ খ্রীস্টাব্দে মুসলিম আক্রমনে জেরুজালেমের অধিকাংশ ইহুদি নিহত হয় কিংবা ইউরোপে পালিয়ে যায়। ১৯ শতকের পূর্ব পর্যন্ত ইহুদিরা ইউরোপ-আমেরিকায় ছিল। ১৯ শতকে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠালগ্নে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ইহুদিরা ইসরাইলে এসে বসবাস শুরু করে। কিন্তু ঐসব ইহুদিদের কারো ভাষাই হিব্রু ছিল না। কারো রুশ, পো্লিশ, জার্মান, ইংরেজি, ফ্রেন্স বা আরবি ছিল। তখন শুরু হয় ইসরাইলে "ভাষা আ্ন্দোলন"।
:
আধুনিক কথ্য ভাষা হিসেবে হিব্রুর পুনঃপ্রতিষ্ঠার নেপথ্যে ছিলেন এলিয়েজের বেন ইয়েহুদা নামের এক রুশ-বংশোদ্ভূত ইহুদী। তিনি ১৮৮১ সালে হিব্রু ভাষা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়ে তৎকালীন উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীন ফিলিস্তিনে আসেন। বেন ইয়েহুদা চাইতেন ফিলিস্তিনে বসবাসরত ইহুদীরা কেবলই হিব্রু ভাষায় কথা বলুক। তিনি হিব্রুকে ঘরে ও বাইরে সমাজের সব ধরনের কাজের চাহিদা মেটাতে সক্ষম একটি ভাষা হিসেবে প্রচলন করার পরিকল্পনা নেন। এজন্য তিনি ইহুদী শিশুরা যাতে ছোটবেলা থেকেই হিব্রুতে শিক্ষা পায়, তার ব্যবস্থা করেন। এভাবে ধীরে ধীরে হিব্রু আবার একটি জীবিত ভাষায় পরিণত হয়।
:
একদা সমৃদ্ধ হিব্রু ভাষা কার্যত অচল হয়ে যাওয়ার দুই হাজার বছর পর ইহুদিবাদ প্রতিষ্ঠা ও ইসরাইল রাষ্ট্র কায়েমের মধ্য দিয়ে এটি নতুন জীবন পায়। অথচ এ ভাষা সামাজিক জীবনে চালু ছিল না। তারপরও হিব্রু ইসরাইলে জাতীয় ভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভাষার ইতিহাসে এ ধরনের দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। কারণ ধ্রুপদ হিব্রু কেবল প্রার্থনার ভাষা হিসেবে ও ধর্মগ্রন্থে সীমিত ছিল। উনবিংশ শতকের শেষভাগে এলিজার বেন এহুদার নেতৃত্বে ব্যাপক প্রচারণা, জাগরণ, ধর্মীয় অনুভূতির ব্যবহার, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনসহ সব পদক্ষেপকে সমন্বিত করার ফল হিসেবে মুখের ভাষা হিসেবে হিব্রুর প্রত্যাবর্তন ঘটতে থাকে। আর সেই হিব্রু, এখন ৭০ লাখ মানুষের ভাষা। বহু আগেই হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রের সক্রিয় সহায়তায় ভাষাটির রাজ্য সমপ্রসারিত হচ্ছে। কিন্ডারগার্টেনে শিশুরা হিব্রুতে কথা বলছে, এমনকি ইসরাইলে যাদের মাতৃভাষা আরবি ও হিব্রু তারাও দ্বিতীয় ভাষার মর্যাদা পেয়েছে। হিব্রু ভাষার এই ফিরে আসা মৃত ও বিপন্ন ভাষায় ফিরে আসার প্রশ্নে একটি মৌলিক শিক্ষা দিয়েছে। আর তা হচ্ছে ভাষাকে ফিরিয়ে আনতে হলে নাগরিকদের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য আবেগ ও উন্মাদনা সৃষ্টি করতে হবে, যাতে সেই আবেগই লক্ষ্য অর্জনে ব্যক্তিকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
:
হিব্রু ভাষা (হিব্রু ভাষায়: 'Ivrit ইভ্রিত) আফ্রো-এশীয় ভাষা-পরিবারের সেমিটীয় শাখার একটি সদস্য ভাষা। এটি হিব্রু বাইবেল, বা ওল্ড টেস্টামেন্ট তথা তোরাহ-র ভাষা।
:
হিব্রু বর্ণমালা (হিব্রু ভাষায়:אָלֶף-בֵּית עִבְרִי [১] আলেফ্বেত্ ইভ্রি) ২২টি বর্ণ নিয়ে গঠিত একটি লিখন পদ্ধতি যা হিব্রু ভাষা লিখতে ব্যবহার করা হয়। এদের মধ্যে ৫টি বর্ণ শব্দের শেষ অবস্থানে ভিন্ন রূপ নেয়। হিব্রু লিপির আরও কিছু সামান্য পরিবর্তিত রূপ প্রবাসী ইহুদীদের একাধিক ভাষা লিখতে ব্যবহার করা হয়। এই ভাষাগুলির মধ্যে য়িডিশ ভাষা, লাদিনো ভাষা এবং জুডেয়ো-আরবি ভাষাসমূহ অন্যতম। হিব্রু লিপি ডান থেকে বাম দিকে লেখা হয়।
:
হিব্রু ভাষার ইতিহাস বৈচিত্র্যময়। নানা কারণে মুখের ভাষা হিসেবে এটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু লিখিত ভাষা হিসেবে এটি আরও বহু শতক টিকে থাকে। এটি ধর্ম, আইন, ব্যবসা, দর্শন ও চিকিৎসা বিষয়ক বহু বই লিখতে ব্যবহৃত হত। ১৯শ শতকের শেষে ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কথ্য ভাষা হিসেবে এটির পুনর্জন্ম হয়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে (প্রধানত রাশিয়া থেকে) বর্তমান ইসরায়েলে (তৎকালীন ব্রিটিশ প্যালেস্টাইনে) ইহুদীরা এসে বসতি স্থাপন করেন এবং তাদের নিজস্ব বিভিন্ন মাতৃভাষা যেমন আরবি, ইডিশ, রুশ, ইত্যাদির পরিবর্তে আধুনিক হিব্রু ভাষায় কথা বলা শুরু করেন। ১৯২২ সালে হিব্রু ব্রিটিশ প্যালেস্টাইনের সরকারী ভাষার মর্যাদা পায়।
:
ইসরায়েলে প্রায় ৭০ লক্ষ লোক হিব্রু ভাষায় কথা বলেন। এছাড়া ফিলিস্তিনী এলাকায় ও বিশ্বের বিভিন্ন ইহুদী সম্প্রদায়ের প্রায় কয়েক লক্ষ লোক হিব্রুতে কথা বলেন। বর্তমানে আরবি ও ইংরেজির পাশাপাশি হিব্রু ইসরায়েলের সরকারী ভাষা। আরব সেক্টরগুলি বাদে ইসরায়েলের সমস্ত সরকারী ও বেসরকারী কাজে হিব্রু ব্যবহার করা হয়। সরকারী স্কুলগুলিতে হয় হিব্রু বা আরবি ভাষায় শিক্ষাদান করা হয়, তবে হিব্রু দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়া বাধ্যতামূলক। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও হিব্রু ভাষাই শিক্ষাদানের মাধ্যম। ইসরায়েলের সংবাদপত্র, বই, রেডিও ও টেলিভিশনের প্রধান ভাষা হিব্রু।
:
তো বাঙালিরা কি কিছু শিখতো পারবো ইসরাইলি জাতির কাছ থেকে? ২০০০ বছর পরও তারা তাদের বিলুপ্ত ভাষাকে ফিরিয়ে এনে নিজ দেশ আর জাতির মাঝে এ ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করেছে রাষ্ট্র ভাষা রূপে? আর ভাষার জন্যে রক্ত দিয়েও আমরা কেবল "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো" গান গেয়ে সময় কাটাবো আর শিখখাকে লিখবো "শিকষা"? কিন্তু কথা আর কাজে এ বিপরিত্য আর কতদিন চলবে আমাদের মাঝে?
লেখাটি ফেসবুকে দেখতে চাইলে নিচের লিংকে যান প্লিজ
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন