বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

সাগরে ভাসছে মানুষ !সাগরে ভাসছে বাঙালি আর রোহিঙ্গা মুসলমান! বিশ্বের ধনী মুসলিমদের মুখে কুলুপ কেন? প্রবন্ধ # ১১


সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের দেশান্তরী হবার তীব্র প্রবণতা ভূমধ্যসাগর অঞ্চল ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় সংকট সৃষ্টি করেছে। দেশে দেশে রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈরাজ্য এবং তজ্জনিত মানবাধিকার লঙ্ঘনই, প্রধানতঃ, ঐসব দেশের নাগরিকদের দেশ ত্যাগ করার ব্যাপারে উৎসাহিত করছে। উচ্চবিত্তের লোকেরা বৈধ পথে দেশান্তর করছে; কিন্তু অল্প বিত্তের মানুষেরা মানব পাচারের দালালদের হাতে অবৈধ পথে দেশান্তরী হতে গিয়ে অনেকেই পথে মারা পড়ছে, অথবা অনেকেই দাস বা দাসী হিসেবে বিভিন্ন দেশে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এই অবৈধ মানব পাচার চক্রে ব্যবসা হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার। যে ব্যক্তি দেশান্তরী হচ্ছে সে তার সম্পদ ও জমিজমা বিক্রি করে দালালদের হাতে টাকা দিচ্ছে, পথে বিভিন্ন ঘাটে টাকা দিতে দিতে ফতুর হয়ে কোথায়ও গিয়ে পৌঁছাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে আর ফিরে আসার পথ পায় না, দেশেও তার অবশিষ্ট কিছু থাকে না। 
:
দেশান্তরী ব্যক্তিদের ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে লক্ষ্য ইতালি, জার্মানী, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, নরওয়ে বা সুইডেন। ঐসকল দেশ কল্যাণকর রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিকের মৌলিক চাহিদাসমূহ রাষ্ট্র পূরণ করে। ঐসকল দেশ মানবাধিকার বিবেচনা করে অনেক সময় আশ্রয়প্রার্থী বিপন্ন মানুষদেরকেও শর্তসাপেক্ষে তাদের দেশে প্রবেশ করার সুযোগ দেয়। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় দেশান্তরী ব্যক্তিদের লক্ষ্য মালয়েশিয়া, যেখানে কাজ করে বাঁচার সুযোগ আছে। যাঁরা উচ্চবিত্ত তাঁরা অনেক টাকা খরচ করে বৈধ পথে আমেরিকা, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়াতে দেশান্তর করার পথ নেন। মালয়েশিয়াতে তাঁরা অনেক টাকা খরচ করে ‘সেকেন্ড হোম’ কিনতে পারেন। বৈধ পথে ঐসকল দেশে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ অভিবাসী হচ্ছে। কিন্তু অবৈধ পথে ইউরোপের দিকে পাড়ি দিচ্ছে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি থেকে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে এবং আফ্রিকা থেকে; এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় প্রধানতঃ বাংলাদেশ থেকে। 
:
বাংলাদেশ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অংশ হিসাবে বৃটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পেয়েছিলো। কিন্তু ঐ পাকিস্তানের মানুষরা বাংলাদেশের মানুষদেরকে নয়, তারা বাংলাদেশের সম্পদকে চেয়েছিলো। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের মানুষ একটি শোষণহীন সমাজ চেয়েছে, নাগরিকের মৌলিক অধিকার পূরণ করার রাষ্ট্রব্যবস্থা চেয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৪ বছর অতিক্রান্ত হলেও এদেশে জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার সুফল পায়নি। ফলে বাংলাদেশের সমাজ এমন অধঃপতিত হয়েছে, যেখানে প্রতারণা আর ধর্মান্ধতাই হলো মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশে গণতন্ত্র আছে বটে, তবে এই তথাকথিত গণতন্ত্র ধনতন্ত্র আর নীতিহীন লোভতন্ত্র’ ছাড়া আর কিছুই নয়। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের জন্য নির্বাচনও হয়, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলি নাগরিকের ভোটাধিকারকে অগ্রাহ্য করে বা কেড়ে নিয়ে জাল ভোটের মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে নেয়। তাই বাংলাদেশের সচ্ছল ব্যক্তিরা অস্ট্রেলিয়া বা কানাডায় দেশান্তর করে বা মালয়েশিয়াতে ‘সেকেন্ড হোম’ করে। বাংলাদেশের গরীব মানুষরা কি নারী কি পুরুষ, আশে পাশের যে কোন দেশে বেঁচে থাকার আশায় অবৈধ পথে পাড়ি দেয়। অবৈধ স্থল ও সমুদ্রেপথে এই গমণ অব্যাহতভাবে চলতে থাকে যতক্ষণ না কোন দুর্ঘটনা ঘটে। 
:
বাংলাদেশের মানুষ অবৈধভাবে স্থলপথে ভারতের দিকে পাড়ি দেয়। ভারতের পরিবারগুলিতে পুত্র সন্তানের তীব্র চাহিদা থাকায় অনেক পরিবারে দাসীর পেটে পুত্র সন্তান নেয়ার চাহিদা আছে। সন্তান ভুমিষ্ট হবার আগে মায়ের পেটে লিঙ্গ জেনে নেয়ার সুযোগ থাকায় এই চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। ভারতীয় পরিবারগুলিতে কন্যা সন্তান পেটে থাকতেই নষ্ট করে দেবার প্রবণতা আছে। তাই বাংলাদেশের মেয়েরা যারা অবৈধ পথে ভারতে যায় তারা ঐরকম পরিবারে বিক্রি হয়ে যায়। ভারতে দেহব্যবসা খুব রমরমা, তাই সেখানেও অনেকে স্থান পায়। বাংলাদেশের অনেক মেয়ে চোরাপথে ভারত হয়ে পাকিস্তানেও চলে যায়। পাকিস্তানে একটি পাঠান যুবককে বিয়ে করতে যৌতুক হিসেবে যে খরচ করতে হয় তার অনেক কম খরচে বাংলাদেশের মেয়ে কেনা যায়। বাংলাদেশের ছেলেরা অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়ার দিকে পাড়ি দেয়। এইপথে যারা পরিবারশুদ্ধ জাহাজে ওঠে তারা রোহিঙ্গা। এই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশের শরণার্থী ক্যাম্পে থাকে। আরাকান থেকে আসার সময় ভিটেমাটি ত্যাগ করে আসায় তাদের কোন পিছুটান নেই। যারা কিছু অর্থসম্পদ নিয়ে আসতে পেরেছে, বা বাংলাদেশে কিছু অর্থসম্পদ সংগ্রহ করতে পেরেছে, তারাই দালালদের উপর ভরসা করে পারিবারসহ সাগরে ভাসে। মায়ানমান থেতে বিতাড়িত এ রোহিঙ্গারা আসলে একটু ঠাঁই পেতে মালয়শিয়া যেতে চায় মুসলিম হিসেবে। কিন্তু মুসলিম সমাজ ঐ রোহিঙ্গা মুসলিমদের কোন ধনী মুসলিম রাষ্ট্রই গ্রহণ করতে চায়না, অথচ ইসলাম ইসলাম করে কত হত্যাই না করছে মুসলিমগণ।
:
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও সামাজিক প্রতারণার ফল আফ্রিকার দেশগুলির মতই নাগরিকদেরকে হতাশ করছে ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভিন দেশে পাড়ি দিতে উৎসাহী করছে। অনেকে মনে করেন বাক স্বাধীনতাই মানবাধিকার। কিন্তু জন্মমাত্র মানুষের মৌলিক অধিকারগুলিও যে মানবাধিকারের মধ্যে পড়ে সেটা তারা বোঝেন না। এই অধিকারগুলির মধ্যে রয়েছে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান। বাংলাদেশের সংবিধান এই অধিকারগুলির কথা বললেও রাষ্ট্রকে দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে বলে না। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা প্রতারক। তারা সুশাসনের প্রতিশ্র“তি দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের সম্পদ লুটপাট করে। এমনকি তারা নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্র দখল করে নাগরিকের ভোটাধিকারও হরণ করে নেয়। 
:
বিশ্বের দুঃশাসনপূর্ণ দেশগুলি থেকে নাগরিকদের দেশত্যাগের যে ঝড় বইছে তা’ থামবে না, যতদিন না ঐসকল দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং নাগরিকদের মানবাধিকার তথা মৌলিক অধিকার পুরণ করার লক্ষ্যে রাষ্ট্র কল্যাণকর হয়। কিন্তু সে দিনটি আর কত দূর? কখন বৈশ্বিক মানুষ সবাইকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে?


লেখাটি ফেসবুকে দেখতে চাইলে নিচের লিংকে যান প্লিজ





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন