ডারইউনের বিবর্তনবাদ আবিস্কারের পর থেকে বিশ্বে তা নিয়ে ইতিবাচক সমালোচনার চেয়ে নেতিবাচক সমালোচনার ঝড় বইছে বেশী, বিশেষ করে ভাববাদীগণের মধ্যে। এর মধ্যে শীর্ষে সম্ভবত আমাদের দেশীয় অবৈজ্ঞানিক চিন্তাচেতনা ধারণকারী মোল্লা-মৌলোভী তথা আধ্যাত্মবাদীগণ। কোনরূপ বিজ্ঞানমনস্ককতাকে লালন না করেও, তাদের হাস্যকর অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক কথাবার্তা শুনে মনে হয় যেন তারা ‘কত বড় বৈজ্ঞানিক’! অথচ বিবর্তনবাদকে বোঝার জন্য এখন আর আইনস্টাইনের মত বড় বিজ্ঞানী হতে হয়না, একটু যৌক্তিক চিন্তাচেতনা থাকলেই আমাদের চারদিকের হাজারো পরিবর্তনে আমরা বিবর্তনবাদকে খুঁজে পেতে পারি প্রতিনিয়ত।
:
যদিও কোন কোন বিবর্তনে লক্ষ-কোটি বছর সময় লেগে যেতে পারে কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানেও বিবর্তন ঘটতে পারে আমাদের চারদিকে, যার কিছু কিছু আমরা লক্ষ করি, আবার কিছু বুঝতে পারিনা। কারণ হচ্ছে, কোন কোন বিবর্তন (উদাহরণ এক প্রাণি থেকে অন্য প্রাণিতে রূপান্তর) যেমন চলন্ত বিমানে বসে আমরা বুঝিনা যে বিমানটি কতবেগে আকাশে ছুটছে কিংবা পৃথিবী তার তাবৎ জিনিসপত্র (এমনকি বাতাস, পানি ইত্যাদিসহ) নিয়ে প্রচন্ড বেগে যে সূর্যের চারদিকে ঘুরছে তা কি আমরা সাধারণভাবে বুঝতে পারি? পারিনা, যদিও তা সত্যি! কয়েকটি উদাহরণের সাহায্যে ব্যাপারটি বোঝানোর চেষ্টা করা যেতে পারে যা নিম্নরূপঃ
:
আমরা সবাই বিশাল বটগাছ দেখেছি কিন্তু মানুষ নানা চেষ্টা তদবিরে সেই বিশাল বটবৃক্ষকে বুড়ো কিংবা পরিণত বয়সেও ‘বামন বনসাই’ বানিয়ে তা কিভাবে সাধারণ ছোট্ট একটি ‘টবে’ আটকে রেখে বিক্রি করছে হাতে হাতে তা কি আমার খেয়াল করছি? এই বিবর্তনটি হচ্ছে মানুষের হাতে কৃত্রিম ও তড়িৎভাবে যা দৃশ্যমান। সাধারণ তেলাপিয়ার চেয়ে মনোসেক্স তেলাপিয়া আকার-আকৃতিতে বিশাল বড়, এটিও মানুষের বিবর্তিত ‘কুইক’ আবিস্কার নয়কি? আমাদের পুরণো টক কুলের বদলে এখন বাজারে এসেছে ‘আপেলকুল’ ও ‘বাউকুল’। এটিও সাধারণ কুলের বিবর্তিত রূপ মানুষ তথা বাউবি আবিষ্কৃত। আমরা জানি পদ্মার ইলিশ দেখতে ও খেতে খুবই চমৎকার। কিন্তু পদ্মার দক্ষিণের মেঘনার ইলিশ পদ্মার ইলিশের তুলনায় কিছুটা ভিন্নতর, মেঘনার দক্ষিণের চরফ্যাশনের ইলিশ আরো ভিন্নরূপের, বঙ্গোপসাগরের মোহনা তথা মনপুরার ইলিশের তুলনায় খোদ বঙ্গোপসাগর থেকে ধৃত ইলিশ অবশ্যই স্বাদে-চেহারা-রূপে ভিন্নতর হয়। এখন শোনা যাচ্ছে চঁাদপুরে কৃত্রিম উপায়ে পরীক্ষামূলক চাষকৃত ইলিশ শুধু আকারেই ছোট নয় চেহারাও অন্যরূপ, যদিও তা পদ্মার ইলিশ থেকে উদ্ভাবনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি হচ্ছে প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিবর্তন। এভাবে নদীর পাঙ্গাশের তুলনায় চাষকৃত পাঙ্গাশ শুধু সাইজেই ছোট নয়; রং, চেহারা ও স্বাদ ভিন্নরূপীয়। গাধা+ঘোড়ার সংমিশ্রণে সৃষ্ট খচ্চরের কথা আমরা কমবেশী জানি। যার আকার ও চরিত্র ঘোড়া গাধার চেয়ে অন্যরূপ।
:
আমরা কেউই সাধারণত চেহারা সুরতে ১০০% মা-বাবার মত হইনা। তাদের কিছু বৈশিষ্ট্য বংশসূত্রে অর্জন করি। আমাদের সন্তানেরা তার দাদা-দাদী ও নানা-নানীর কিছু অংশ পেলেও পরবর্তী ১০-২০ জেনারেশন পূর্বের ও পরের বংশীয় স্রোতধারা কতটুকু তাদের ভিতর বজায় থাকে তা গভীর নিরীক্ষার বিষয়। একবার আমি নদীকে একটি শিং মাছ পেয়েছিলাম, যার গায়ের রং ছিল সাদা কিন্তু সাধারণক শিং মাছ লাল বা কালছে হয়ে থাকে পুকুর বা ডোবার কারণে। কৃষ্ণাঙ্গ বাবা ও শেতাঙ্গ মায়ের গর্ভের সন্তান কখনো শেতাঙ্গ, আবার কখনো কৃষ্ণাঙ্গ কিংবা আবার তৃতীয ধারা তথা মিশ্র হওয়াও স্বাভাবিক। তাদের চুল ও গায়ের রঙে পরিবর্তন ঘটবে এখন সামান্য কিন্তু ১০-২০ জেনারেশন পর তৃতীয় ধারা সৃষ্টি হওয়া বিচিত্র নয়। আমাদের পরিবারে নিজস্ব গরুর খামারে পালিত সাদা রংয়ের খাটো বাংলাদেশী জাতের গাভীকে যখন লাল সিন্ধি ষাঁড়ের ক্রোস করানো হলো, তাতে নতুন গরুর গাভী বাচ্চাটি হয়েছিল লালচে সাদা রংধারী ও আকৃতিতে বেশ বেড়। ঐ বাছুরটিকে পরিবর্তীতে পরিণত বয়সে অষ্ট্রেলিয়ান কালো ষাড়ের প্রজনন করানো হলে, পরবর্তী বাছুরটি খুবই বড় আকৃতির এবং তাতে সাদা, লাল ও কালো রংয়ের মিশ্র গায়ের রং সৃষ্টি হয়। এগুলো আসলে আমাদের চোখের সামনেই সাধারণ বিবর্তন।
:
একইভাবে অনেক বছর আগে আমার জনৈক আত্মীয় হজ্জের সময় সৌদি আরব থেকে খেজুর আনলে, তার চারায় বাংলাদেশে খেজুর গাছ জন্মে কিন্তু বাংলাদেশী অসংখ্য খেজুর গাছের মধ্যে ঐ গাছটির খেজুর আকৃতিতে বড় হলেও, তার খেজুরের বিঁচিও বাংলাদেশী খেজুরের মত আকৃতিতে বড় হয় ও মাংস হয় সামান্যই। কারণ ঐ গাছটির চারপাশে বাংলাদেশী জাতের খেজুর গাছ থাকাতে, এই দেশী পুরুষ গাছের ফুলের সাথে সম্ভবত তার পরাগায়ন ঘটে। এই পরিবর্তন নানা কারণে ঘটতে পারে। জিন ছাড়াও প্রাকৃতিক কারণে নানারূপ পরিবর্তন ঘটে, যা প্রতিনিয়ত হচ্ছে আমাদের চোখের সামনেই। একজন পেশাদার জেলের পা সারাদিন নৌকায় পানিতে ভেজা থাকার কারণে তার পা কালো ও রুক্ষ থাকে কিন্তু ঐ জেলে আধুনিক কোন গার্মেন্টস-এ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে কাজ করলে তার পা খসখসে থাকবে না পরিবেশের কারণে। এভাবে শুধু জীবে নয় জড় পদার্থেও প্রতিনিয়ত বির্বতন চলে। একটি পাথরের পাহাড়ের আসেত্ম আসেত্ম বিবর্তন ঘটে রাসায়নিক কারণে, পাথরগুলো হাজার হাজার বছরে লালচে বা কালো রং ধারণ করে। পারমানবিক বিস্ফোরণের কারণে ভিন্ন আকৃতি প্রকৃতির প্রাণি জন্ম নিতে পারে ঐ এলাকায়। যেমন জাপানের হিরোশিমা নাগাসাকিতে হয়েছিল। একই বাবা-মায়ের সন্তানেরা গায়ের রং, চেহারা ও মেধা-মননে ভিন্নতর হয়। এরূপ শত শত, হাজার হাজার ও লক্ষ লক্ষ বছরে প্রাণিদের মধ্যে বিবর্তন না হওয়াই বরং আশ্চর্যের বিষয় বর্তমান বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের আলোকে।
:আমাদের ভাববাদীরা আমাদের জাতির মধ্যে নানাবিধ অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক কথাবার্তা বলে আমাদের পেছনে টেনে রাখছে, গণিত আর যৌক্তিকতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে না নিজ জীবন আর মননে, যে কারণে বিশ্ব যখন নানাদিকে এগিয়ে চলছে, তখনো আমরা তাদের আধ্মাত্যবাদী কথাবার্তায় মধ্যে ডুবে থাকছি। পাশ্চাত্যের লোকজনও হয়তো চাইছে আমরা এভাবে অন্ধকারে ডুবে থাকি, আর বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করুক তারা। আবার আমাদের এ সমাজেও এর প্রতিবাদ বা প্রতিকার হচ্ছে না দৃশ্যমানরূপে। কিন্তু এ জাতিকে জাগাতে হলে অবশ্যই সবকিছুর উর্ধে যুক্তিকে প্রাধান্য দিতে হবে, শিক্ষা ধারায় আনতে হবে পরিবর্তন, আর বন্ধ করতে হবে হাস্যকর অলৌকিক অযৌক্তিক মোল্লাতন্ত্রীয় কথাবার্তা। নাহলে আমাদের তিমির কাটবে না কোনদিন। এ জাতি এ জন্যে অপেক্ষা করবে আর কতকাল?
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন