শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

বৈশ্বিক মানুষ ভার্সাস দেশান্তরি মানুষ ভার্সাস মহাকাশে মানুষ : ২ প্রবন্ধ # ৪১



৬ পর্বের বড় লেখার পর্ব :
:
পত্রিকায় দেখলাম ২-৩ বছরের মধ্যে মঙ্গল অভিযানে যাবে মনুষ্যবাহি নভোযান। তার ট্রায়াল চলছে হাওয়াই-য়ে। ঠিক এ সময় একই পত্রিকার প্রধান সংবাদ প্রায় প্রতিদিন ভূমধ্যসাগরে পাওয়া যাচ্ছে ভাসমান অভিবাসি, যাদের কেউ মৃত কেউ মৃতপ্রায়। যা কদিন আগে সোনা গিয়েছিল বাংলাদেশ, মায়ানমার, মালয়শিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া সন্নিহিত সমুদ্রে। এ মৃত বা মৃতপ্রায় মানুষগুলো জীবনের ঝুকি নিয়ে সাগরে নিমজ্জিত হচ্ছে অভিবাসন পেতে। কি সে সোনার অভিবাসন?
:
অভিবাসন বা ইংরেজি Immigration বলতে এক দেশ থেকে অন্য আরেকটি দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের লক্ষ্যে মানুষের দ্বিতীয় দেশটিতে প্রবেশের ঘটনাকে বোঝায়। এর বিপরীত হলো দেশান্তর Emigration যার অর্থ স্থায়ীভাবে কোন দেশ ত্যাগ করা। এটা ব্যাপকভাবে ঘটেছিল ১৮-১৯-২০ শতকে। ইউরোপিয়ানরা এভাবে দেশান্তরি হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যাল্ড, আমেরিকার উভয় অংশ, আর সমুদ্রপথে দখল করেছিল সমুদ্রের নানা দ্বীপ। এখন যেমন মিয়ানমার-বাংলাদেশ বা লিবিয়ার উপকুল থেকে সমুদ্রপথে পাড়ি দিতে গিয়ে বিঘোরে প্রাণ দিচ্ছে শত শত মানুষ। ঐ সময়ও একই ব্যাপার ঘটেছিল ইউরোপীয় দেশান্তরলোভি মানুষের ভাগ্যে। পাথর্ক্যটা এই যে, তখন কোন পাসপোর্ট ভিসাছিলনা বলে সবাই যেতে পারতো সবার দেশে। কিন্তু ই্‌উরোপের মানুষেরা যখন তাদের দেশ দখল, আর দেশান্তরি কোটা পরণ করলো, তখন বানালো পাসপোর্ট ভিসা নীতি, যাতে তাদের নিজ দেশে এবং দখলকারী দেশের সম্পদ আর সুখে ভাগ না বসাতে পারে তাদের প্রাক্তন লুটে খাওয়া ঔপনিবেসের গরিব মানুষেরা কিন্তু একটি মাত্র গ্রহের মানুষ হিসেবে এ বিভাজন মানবে কেন বৈশ্বিক দ্রোহি মানুষ? তাই যেভাবে পারছে চেষ্টা করছে দখলকারীদের দেশে ঢুকতে তথা সুখ কিনতে। কিন্তু মহাপঙ্কিল পথে হাঁটতে গিয়ে মৃত কাউকে ছিনিয়ে নিচ্ছে জীবন থেকে। কারণ রাষ্ট্র, সমাজ, আর প্রকৃতি সবই বৈরি এসব সর্বহারা মানুষের প্রতি।
:
দেশান্তরির গল্প
:
পত্রিকায় প্রকাশ কক্সবাজার অঞ্চল থেকে গত কয়েক বছর ধরে সমুদ্র পথে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় নির্বিঘে একটি চক্র মানব পাচার করে আসছে। বেকারত্ব ঘুচাতে সমুদ্র পথে স্বপ্নের দেশে যাওয়ার সময় অনেকেরই সলিল সমাধি ঘটেছে। দালাল চক্রটির বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগের কারণে সে সকল হতভাগ্য যুবকদের পরিবারের মাতম আজও ধামাচাপা পড়ে আছে। এদের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে ট্রলার ডুবির ঘটনায় নিখোঁজ হয়েছে হতভাগ্য অনেক যুবক। এদের মধ্যে গভীর সমুদ্রে ট্রলার ডুবির পর তিনদিন মাছের ড্রাম ধরে ভেসে ছিলো শামীম নামে এক যুবক। গাঁয়ে সাগরে দীর্ঘ সময়ে থাকার কারণে দেহের বিভিন্ন স্থানে ফোসকাসহ অনেক চিহ্ন রয়েছে। তারপর নিয়ে যাওয়া হয় টেকনাফ সীমান্তে। প্রত্যেককে কালো হাফ পেন্ট ও কালো গেঞ্জি পড়িয়ে জেলে সাজিয়ে বিজিবির চোখকে ফাঁকি দিয়ে ডিঙ্গি নৌকায় করে দালাল চক্র রওয়ানা হয় গভীর সমুদ্র পথে। ডিঙ্গি নৌকায় আধা ঘন্টা চলার পর দালাল ৬ জনকে তাদের সম্মতিতেই ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করে মাছের ড্রামে বিশেষ কায়দায় রেখে দেয়। বাকিরা জেলে সেজেই সমুদ্র পাড়ি দেয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেয়। শামীম বলেন, যাদের অজ্ঞান করে ড্রামে ভরা হয়েছিলো তারা মূলত ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা কম দিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্বেও দালালদের এই কৌশল মানতে রাজি হয়েছিলো। মাছের ড্রামে ভরে ৬ জনকে এবং জেলে সাজিয়ে বাদ বাকিদের মাঝ সমুদ্রে একটি মাছ ধরার ট্রলারে উঠানো হয়। গভীর সমুদ্রে যাওয়ার পরপরই উত্তাল সাগরে ট্রুলারটিকে টালমাটাল মনে হচ্ছিল। মালয়েশিয়া যাবার স্বপ্নে বিভোর মানুষগুলো জীবন বাজি রেখে সমুদ্র পাড়ি দেবার চিন্তা করতে থাকে। মাছ ধরার ট্রলার যোগে আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিলো থাইল্যান্ড। পরে থাইল্যা- এর সীমান্তে জঙ্গল দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে মালয়েশিয়ার পৌছে দেয়ার কথা। এরপর মালয়েশিয়ার স্থানীয় এজেন্ট আমাদের রিসিভ করে থাকা খাওয়ার ব্যাবস্থা করে চাকুরীতে প্রবেশ করানোর শর্ত পুরণ করবে। আমাদেরও স্বপ্ন পূরন হবে। ১০ জুন খারাপ আবহাওয়ার কারনে উত্তাল সাগরে টলারটি ডুবে যায়। আমি ড্রাম আকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি। তিন দিন তিন রাত আমার কাছে ছিলো মৃত্যুর বিভীষিকাময়।
:
দীর্ঘ ০২ মাস প্রাণ রক্ষায় সাগর যুদ্ধ করে ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে পৌছে। সেখানে তাদের ভাসমান ট্রলার ডুবে যেতে দেখে জেলেরা এগিয়ে এসে উদ্ধার করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে ট্রলারের ৭শ জন অভিবাসীকে। ১ মাস ৭ দিন ইন্দোনেশিয়ায় থাকার পর গত ২৯ জুন দেশে ফিরে আসে সাগরযুদ্ধে বেচে থাকা নুরুল কবির। তাকে ভাগ্য বদলানোর প্রলোভন দিয়ে গত ৩ মাস পূর্বে শাহপরীরদ্বীপ উপকূল হতে একটি ফিশিং বোটে তুলে মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থান করা আদম ভর্তি কার্গোতে তুলে দেয়। ঐ কার্গোটি ২২ দিন সেখানে অবস্থান করে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী ৫ শতাধিক নারী পুরুষকে নিয়ে মালেয়শিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে। ২০/২৫ জন সশস্ত্র দালাল কার্গোতে ছিল। ৭ দিন ৭ রাত কার্গোটি চালিয়ে থাইল্যান্ডের উপকূলে পৌছে। সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে থাইল্যান্ড সীমান্তে ১৩ দিন অবস্থান করার পর কার্গোটি গভীর সমুদ্রে চলে গিয়ে অপর ২টি মালয়েশিয়াগামী ভাসমান ট্রলার একত্র করে ঐ ট্রলার ২টির লোকজনকে বড় কার্গোতে তুলে। এমতাবস্থায় দীর্ঘদিন ভাসতে থাকায় নরনারীর রশদপাতি শেষ হয়ে পড়ে। এ সময় দীর্ঘ দিনের ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্থ নর-নারী কার্গোতে হৈ চৈ করলে আদম পাচারকারীরা এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ৩ জন মারা যায়। তাদের এ কার্গোতে অপর ২ ট্রলারের লোকসহ ১২শ মানুষ সাগরে ভাসতে থাকে। এ অবস্থাতে ঐ কার্গোতে প্রচন্ড ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় কাতরাতে কাতরাতে মারা যায় অনেক নারী-পুরুষ। এভাবে দিনের পর দিন সাগরে ভাসতে ভাসতে ইন্দোনেশিয়া সমুদ্র উপকূলে পৌছে এবং সেদেশের নৌ বাহিনী আটক করে নৌজাহাজে বেঁধে মালেয়শিয়া সমুদ্র উপকূলে নিয়ে ঠেলে দেয়। সেখানে ভাসতে থাকে দিনের পর দিন। এহেন অবস্থায় খাবারকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশীদের মাঝে ব্যাপক সংঘাত বাঁধে। সংঘাতে মারা যায় শতাধিক মানুষ। অসংখ্য লোক সাগরে লাফ দিয়ে প্রাণ হারায়। গভীর সমুদ্রে ভাসমান ট্রলারটিতে সংগঠিত মারামারি ছাড়াও ক্ষুধার তৃষ্ণায় মারা যায় আরো বিপুল মানুষ। কার্গোতে থাকা ১২শ জনের মধ্যে ৪ শ নর-নারীর করুণ মৃত্যু হয় বলে সাগর যুদ্ধে বেঁচে থাকা নুরুল কবির জানান। তিনি আরো জানায় মারামারির পর কয়েকদিন কার্গোটি সাগরে ভাসতে ভাসতে ফের ইন্দোনেশিয়া সাগরে পৌছে ফুটো হয়ে সাগরে ডুবে যাচ্ছি। এ অবস্থায় কিছু সংখ্যক ইন্দোশিয়ান জেলের নৌকা এগিয়ে এসে তাদের উদ্ধার করে কুলে নিয়ে যায়। সাগরে যুদ্ধে বেঁচে ফেরত আসা নুরুল কবির এ প্রতিবেদককে হৃদয়বিদারক কাহিনী বর্ণনা দেয়া কালে দুঃসহ স্মৃতির কথা মনে করে বার বার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিল।
:
অসহায় সাগরে ভাসমানদের নিয়ে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মায়ানমার নিষ্ঠুর কানামাছি ভোঁভোঁ খেলছে, নামমাত্র খাদ্যপানীয় ধরিয়ে দিয়ে আশ্রয়প্রার্থী ট্রলারগুলোকে আবার অথৈ পাথারে ঠেলে দিচ্ছে, বিশ্ববিবেক তাকিয়ে দেখছে দক্ষিন এশীয় আঞ্চলিক রুটে আন্তর্জাতিক মাফিয়াচক্রের দ্বারা নিষ্ঠুরভাবে প্রতারিত অসহায় রুগ্নক্লিষ্ট কঙ্কালসার সর্বহারা মানুষগুলোর নিশ্চিত সলিলসমাধি। অবশেষে তীব্র সমালোচনার মুখে মায়ানমার ৭০৬ যাত্রীকে তীরে তুলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করেছে, তাদের নৌবাহিনী বিশেষ কৃতিত্বের সাথে ৭০৬জন বাঙ্গালীকে ক্ষনিক আশ্রয় দিয়েছে সমুদ্র উপকুলের এক মানবিক সাহায্যহীন অস্থায়ী ক্যাম্পে, ক্ষুধার তাড়নায় একবোতল বৃষ্টির পানির জন্য দলবেঁধে ক্যাম্পের বাহিরে জড়ো হওয়া পত্রিকার পাতার ছবি আমারও চোঁখ এড়িয়ে যায়নি। আন্তর্জাতিক মহলের পীড়াপীড়ি স্বত্ত্বেও মায়ানমারের জাতিগত ধারাবাহিক দাঙ্গায় বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে ক্যাম্পে আশ্রয়প্রাপ্ত ৫লাখ রোহিঙ্গা ফেরত নেয়ার ইস্যুতে আঞ্চলিক বা দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ইয়াঙ্গুনকে আজও বসানো সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে আশ্চর্য কথা, মায়ানমার সরকার, এমনকি কথিত শান্তিতে নোবেলজয়ী সুচি কখনোই এই ইস্যুতে ন্যুনতম বিবৃতি বা রোহিঙ্গা শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করেনি, তাদের ভাষায় রোহিঙ্গা মানে বাঙ্গালী বা কালা। বৌদ্ধ রাষ্ট্র মায়ানমার ছলে বলে দাঙ্গার কবলে ফেলে কৌশলে তাদের সীমান্তের এপারে ঠেলে দিচ্ছে, আর বাংলাদেশে দিনের পর দিন তাদের অনাকাঙ্খিত চাপ বাড়ছেই। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ কেন তার পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক আভ্যন্তরীন সমস্যার জের টানবে? গত পাঁচ দশকেও বৌদ্ধ রাষ্ট্রটির কাছে থেকে বাংলাদেশ এই ব্যাপারে কোন কুটনৈতিক সদুত্তর পায়নি। তাই ঢাকা থেকে সাঁফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে, আগে পরিচয় নিশ্চিত হয়েই প্রত্যাবর্তনের কাজ শুরু করতে চায়। তাহলে রোহিঙ্গাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় জানাটাও জরুরী, মুলত এই রোহিঙ্গা কারা?

 লেখাটি ফেসবুকে দেখতে চাইলে নিচের লিংকে যান প্লিজ


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন